গোল-কিপার নম্বার টু
ফকির আবদুল মালেক
হেমন্তের বিকেল। নরম রোদ পৌঢ়া বিধবার হৃদয়ের মত ম্লান। নদীর ওপারে চরে কাশফুলের মেলা। সাদা সাদা আরো সাদা। বাতাস বইয়ে নিয়ে আসে কাশফুলের পেলব কেশর এই পারেও। শহরের ব্যস্ততার মাঝে এইসব ঋতুময় চিহ্নগুলো হারিয়ে যায়। কেউ তার খোঁজ রাখে না। তবু প্রকৃতি তার উপস্থিতির সংকেত পাঠায়। বাতাস তেমনি এক আবহ নিয়ে আসে শীতের । একটা ঠান্ডার আমেজে দেহে নিয়ে আসে প্রফুল্ল আমোদ। নদীর পাড়ে বেড়াতে আসা মানুষগুলি আনন্দিত হয়, বিনোদিত হয় ।
এরই মাঝে ব্যবসা চলে। কত ধরনের জীবিকা যে মানুষ গ্রহন করে ! ক্যানভাসাররা নানা রকম পণ্যের বিজ্ঞাপন নিয়ে আসে অভিনব পন্থায়। প্রথমে সাপের খেলা। ও বিধির কি….হইল……. । বীণ বাজে……..। তারপর লোক জড়ো হলে তাদের নানা রকম তাবিজ বিক্রির পায়তারা চালায়। এমনি একটা জটলা জমেছে নদীর পার ঘেষা ফাঁকা প্রান্তরে। বড় বড় মানুষের ভিড় ঠেলে সামনের দিকে চলে আসে বার-তোর বছরের এক বালক। তন্ময় হয়ে সাপ খেলা দেখতে থাকে।
ছেলেটির নাম শাওন। স্বাভাবিক আচরন করে না সে। এই বয়সে একজন ছেলে হবে চটপটে, দুরন্ত- সে তা নয়, অন্যের সাথে মিশতে পারে না। সামাজিক আচরণগত সমস্যা আছে তার। অন্য যতগুলো বালক এই জটলায় দাড়িয়ে আছে তারা খুব মজা পাচ্ছে । শাওনা পাচ্ছে না। একাগ্র চিত্তে সে খেয়াল করছে ক্যানভাসারের বক্তব্য। লোকটি বলে যাচ্ছে তার হাতে যে শিকড় আছে তা এক ধরনের দুর্লভ বনজ গাছের শিকড়। যে কোন বিষাক্ত সাপের সামনে ধরলেই সে সাপ দৌড়ে পালায়। সাপের সামনে শিকড়টি ধরতেই সাপটি উল্টোদিকে দৌড়ে পালালো।
শাওন খুব মনোযোগের সঙ্গে পুরো ব্যাপরটি লক্ষ্য করছিল। বীন বাজাবার সময় সাপ টা যে দিকে বীন যায় সে দিকে নড়ে উঠছে তার সামনের দিকে গেলেই ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ শাওন বলে উঠলো, সাপগুলোর সামনে যে কোন লতা ধরলেই পালাবে। কোত্থেকে জানল সে? বলতে পারে না। গভীরভাবে সে যখন কোন কিছুর প্রতি মনোযোগ দেয় তখন তার নিকট সব কিছু কেমন যেন পরিস্কার হয়ে ওঠে। কোন রহস্যই প্রকৃত ঘটনাকে ঢেকে রাখতে পারে না।
সাপুড়ে ক্ষেপে গেল। তাকে আহ্বান জানালো যে কোন লতা নিয়ে সাপের সামনে আসতে।
কোন দিকে খেয়াল করল না শাওন, সে কিছু দেখতেও পারল না তার চারপাশের পরিবেশ। একটা শুকনো লতা নিয়ে সাপের সামনে ধরতেই সাপটা পালাল। মজমায় একটা শোরগোল বেঁধে গেল। জমজমাট এই লোক সমাগম মুহুর্তে খালি হয়ে গেল।
সাপুড়ে স্তম্ভিত হয়ে গেল। তার চল্লিশ বছরের ব্যবসার জীবনে এধরনের ধাক্কা সে খায় নি কখনো। শাওন তার দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ সাপুড়ে গুরু বলে তাকে প্রনাম করতে এলো । বিস্ময়ের ধাক্কাটা সমালাতে পারলো না শাওন। দৌড়ে পালাল। দে দৌড়… দে দৌড়…।
হাপাতে হাপাতে সে খেলার মাঠের দিকে চলে এলো । তার স্কুলের ফুটবল টীম প্রেকটিস করছে। শওকত স্যার তাদের নানা ধরনের কৌশল দেখাচ্ছেন। ফুটবল টুর্ণামেন্ট চলছে। জমজমাট আয়োজন। কতদিন শাওন মনে মনে ভেবেছে সে দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বল নিয়ে, সমস্ত দর্শক হৈ হৈ করে উঠছে। একজন, দুজনকে কাটিয়ে গোলপোষ্টে কিক, চারিদিকে হৈ হৈ আওয়াজ গোল… গো…..ল………। এমনই ভাবুক হয় সে মাঝে মাঝে।
তাদের স্কুলের সেরা স্ট্রাইকার রাইসুল তার প্রিয় খেলুয়াড়। শুধু তার একার নয়, পুরো টুর্নামেন্টেরই সে সেরা খেলুয়াড়। একটার পর একটা গোল করে তাদের স্কুলের সম্মান বাড়িয়ে দিচ্ছে। রাইসুল শাওনকে খুব আদর করে। কারো সাথে মিশতে না পারা শাওনকে রাইসুল প্রায়ই কাছে ডাকে। আজকেও রাইসুলই দেখলো তাকে। দেখেই হাতের ইশারায় কাছে ডাকল। স্যারের সাথে কি পরামর্শ করল।
স্যার বললেন: খেলবে?
কোন কথা বলল না সে , মাথা নুইয়ে ইঙ্গিতে বললো- হ্যাঁ।
তার কি যে আনন্দ লাগছে তা কাউকে বুঝাতে পারবে না সে। তাকে বলা হলো গোল কিপারে দাড়াতে। আসলে ব্যাপার হলো তাদের সেরা একাদশে যে গোল-কিপার আছে প্র্যাকটিসের সময় সে তো আছেই কিন্তু দুই নম্বার গোল কিপারের জ্বর । কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না তাই তাকে প্রক্সি দিতে ডাকা হলো। শাওন মহা খুশি । প্র্যাকটিসের সময় দুই দলে ভাগ করে খেলা হয়। রাইসুলের দলে থাকতে চাইল সে কিন্তু তাকে দেয়া হলো রাইসুলের বিপরীত দলে। এবং মজার ব্যাপার এই যে রাইসুলের কয়েকটি কড়া শট ফিরিয়ে দিয়ে স্যারের দৃষ্টি আকৃষ্ট করে ফেললো।
প্রতিদিন প্র্যাকটিসে যায় শাওন কিন্তু টুর্ণামেন্টের কোন খেলায়ই চান্স পায় না। তাদের স্কুল দুর্দান্ত সফলাতা পেয়ে ফাইনালে উঠে গেল। রাইসুল একক ভাবে পুরো টুর্ণামেন্টে বারটি গোল করে বিশাল স্টার হয়ে উঠেছে। শাওন মনের ভাবাকে কখনও কাউকে বলতে পারেনি। তবু একদিন বলল-রাইসুল ভাই আমাকে একদিনও চান্স দিলেন ন। রাইসুল বলল- প্রতিদিন প্র্যাকটিশ কর- সুযোগ এলেই দলে নিব।
তারপর একদিন সুযোগ এলো, সে আবার ফাইনালের দিন। সেমি-ফাইনালের দিন প্রথম গোল-কিপার জাম্প করতে গিয়ে হাতে ব্যাথা পেয়েও খেলা শেষ করেছে বটে কিন্তু আজ ফাইনালের দিন কিছুতেই হাত নাড়তে পারছে না। ডাক পড়ল শাওনের। কি যে উত্তেজনা তার হৃদয়ে বইয়ে যাচ্ছে কাউকে বোঝাতে পারবে না সে। কিন্তু স্কুলের সব কর্মকর্তা বিশেষ করে শওকত স্যারের মনটা ভীষন খারাপ। পুরো টুর্ণামেন্ট অসম্ভব ভালো খেয়ে যে গোল-কিপার সেরা খেলোয়াড় হওয়ার জন্য রাইসুলের সাথে প্রতিযোগীতা করছে সে-ই গোল-কিপার ছাড়া গুরত্বপূর্ণ ফাইনাল কিভাবে সম্ভব?
শুধু একজন। সে রাইসুল। সাহস যুগিয়ে যাচ্ছে। কাঁধে হাত রেখে শুধু বলল- শাওন এই খেলাটা শুধু খেলা নয়। এটা আমাদের স্কুলের সম্মান। শাওন একফোটা চিন্তিত হলো না। দাড়িয়ে গেল। যে ভাবেই হোক স্কুলের সম্মান তাকে রাখতেই হবে। যে ভাবেই হোক রাইসুল ভাইকে সেরা খেলোয়াড় হওয়ার পুরস্কারটা এনে দিতেই হবে।
খেলা শুরু হলো। দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে চলছে খেলা।
রাইসুল, কাজল, স্বপন তিনজন ফরোয়ার্ড। ছোট ছোট পাসে খেলা শুরু করল। কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই রাইসুলের দেয়া গোলে এগিয়ে গেল শাওনদের স্কুল। চারিদিকে হৈ হৈ , চিৎকার চেচামেচি। কিন্তু এরপর প্রতিপক্ষ নিয়েছে এক কৌশল- যখনই রাইসুল বল ধরতে গেছে পেছন থেকে কিম্বা সামনে থেকে ফাউল করে ফেলে দিচ্ছে। কাজল মাঝে মাঝে টান দিয়ে নিয়ে গেছে বটে কিন্তু কিছুতেই আর গোলের দেখা পাচ্ছে না। হঠাৎ প্রতিপক্ষ দু চারটা শট নিয়েছে, বেশীর ভাগ সটই গোলবারের উপর দিয়ে গেলেও শাওন রক্ষা করেছে কমপক্ষে একটি নিশ্চিত গোল। দর্শকের এদিকে খেয়াল থাকার কথা নয়। তারা গোল চায়। রাইসুল বল পায়ে পেলেই চিৎকার করে উঠে। প্রথমার্ধ শেষ হয় ১-০ গোলে।
বিরতির পর খেলা যেন পাল্টে গেল। রাইসুল আর দাড়াতেই পারছে না। বল কেবল শাওনদের সীমানাতেই গড়াগড়ি করতে থাকে। হঠাৎ প্রতিপক্ষের দুর্দান্ত আক্রমনে গোল খেয়ে ফেলে শাওন। পিছন থেকে সকলে হতাশ। ১-১ গোলে খেলা শেষ। আতিরিক্ত সময়ে আর কেউ গোল করতে পারেনি।
খেলা চলে গেল টাইব্রেকারে।
শাওনের দল প্রথমে শট নিলো। গোল । ১-০ গোলে এগিয়ে গেল তারা।
এবার শাওনের পালা।
শাওন দাড়িয়ে আছে বারে। । গোল। ১-১ এ সমতা।
এবার রাইসুল শট নিতে যাবে। সকলে প্রস্তুত । বারের উপর দিয়ে চলে গেল। গোল থেকে গেল ১-১ ।
মাঠে পিন পতন নিস্তব্ধতা। এবার শাওন দাড়িয়ে আছে বারে। বল চলে গেল বারের উপর দিয়ে। ১-১।
এভাবে চলতে চলতে খেলা চলে এলো এক চরম উত্তেজনা কর পরিস্থিতিতে। শাওনের দল ৩-২ গোলে এগিয়ে । প্রতিপক্ষের সর্বশেষ শট নিতে প্রস্তুত । মাত্র একটি শট ফিরিয়ে দিতে পারলেই জয় পাবে শাওনেরা।
দাড়িয়ে আছে শাওন। পৃথিবীর কোন দিকে তার কোন খেয়াল নেই। সমস্ত দৃষ্টি বলের দিকে। রাইসুল এসে বলল তোমার উপর সব নির্ভর করছে আমাদের জয়-পরাজয়। বারবার শওনের মনে হতে লাগল রাইসুলের ভালোবাসার কথা আর স্কুলের সম্মান এখন তার হাতে। ছুটে আসছে প্রতিপক্ষের সবচেয়ে কৌশলী খেলোয়াড়। ডজ্ দিতে তার জুড়ি নেই। মনে হচ্ছে ডানদিকে সট নিবে, কিন্তু নিলো ঠিক বাম দিকে ক্রশবারের বরাবর। শাওন খোলোড়ারের কৌশলে বিভ্রান্ত হলো না, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বলের দিকে। রাইসুলের প্রতি ভালবাসার মুল্য দিতে আর স্কুলের সম্মান বাঁচাতে সে জানবাজি রেখে জাম্প করল। বল হাওয়ায় উড়ছে, শাওন উড়ছে। হঠাৎ থমকে গেল বলের গতি, জমে গেল শাওনের হাতে।
হৈ হৈ চিৎকারে মাঠ কেঁপে উঠলো। শওকত স্যার দৌড়ে এলো শাওনের দিকে, আনন্দে কাঁধে তুলে নিলেন। কাঁধে চড়ে শাওন খেয়াল করল, রাইসুলের চোখ চকচক করছে বিজয়ের আনন্দে।
ভালোবাসর কাছে হেরে গেল প্রতিপক্ষের সমস্ত কৌশল।
ভালোবাসার কাছে হেরে গেল প্রতিপক্ষের সমস্ত কৌশল।
বড় শক্তি
সত্যি ভালোবাসার শক্তির কাছে হেরে যায় সমস্ত শক্তি।
ভালবাসার অনেক শক্তি!
আজ আমাদের প্রয়োজন শুধু একটুখানি ভালবাসা যা আজ বিলুপ্ত হতে বসেছে।
এমনকি মা ও ভালবাসেন যে ছেলে বেশী রোজগার করে তাকেই।
জি ভাই আমরা ভালবাসার শক্তিতে শক্তমান হতে চাই।
পরিসমাপ্তিতে আমাদের সমাজ জীবনের যে অসঙ্গতি আজ সর্বত্র
তারই ছোট বার্তায় গল্পটির সার্থকতা এসেছে।
শুভ সকাল প্রিয় বন্ধু ফকির আব্দুল মালেক।
শুভ বিকাল।
সকালে যে শুভ কামনা দিয়াছেন ঢেলে বিকালে তাহা দিলেম ফিরিয়ে। আমাদের শুভ হোক।